নিউজ ডেস্ক :-এপ্রিল শেষ হতে না হতেই যেন আগুন ঝরছে আকাশ থেকে। সকাল গড়াতেই রাস্তাঘাট ফাঁকা, দুপুরে কার্যত জনজীবন স্তব্ধ। চরম গরম ও ভ্যাপসা অস্বস্তিতে নাজেহাল পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, অনেকেই বলছেন— “রাজস্থান নয়, এখন বাংলাই যেন থর মরুভূমি!” দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে, তার সঙ্গে অতিরিক্ত আর্দ্রতা পরিস্থিতিকে আরও অসহনীয় করে তুলেছে।
আবহাওয়া দফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর গরম অনেক বেশি অস্বস্তিকর। ২০২২ সালে পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় তাপমাত্রা ৪৩-৪৪ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠেছিল। ২০২৪ সালে পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ায় পারদ ৪৫ ডিগ্রির কাছাকাছি পৌঁছয়। আর ২০২৬ সালে ফের তাপপ্রবাহের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে দক্ষিণবঙ্গ জুড়ে। বিশেষ করে পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলাগুলিতে সকাল থেকেই তীব্র রোদ ও গরম হাওয়া বইছে।
বর্তমানে কলকাতায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রির আশেপাশে থাকলেও অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে “Real Feel” বা অনুভূত তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রির কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে।
জেলা ভিত্তিক তাপমাত্রার ছবিটাও যথেষ্ট উদ্বেগজনক—
পুরুলিয়া : ৪১°-৪২°C
বাঁকুড়া : ৪০°-৪১°C
পশ্চিম বর্ধমান (আসানসোল) : ৪০°C
বীরভূম (সিউড়ি) : ৩৯°-৪০°C
মুর্শিদাবাদ : ৩৮°-৩৯°C
নদিয়া : ৩৮°C
কলকাতা : ৩৭°C
হাওড়া : ৩৭°C
উত্তর ২৪ পরগনা : ৩৭°C
ঝাড়গ্রাম ও পশ্চিম মেদিনীপুর : ৪০°C-এর কাছাকাছি ।
আবহাওয়াবিদদের মতে, এই চরম গরমের পিছনে মূল কারণ হল পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আসা শুষ্ক ও উষ্ণ বায়ু। পাশাপাশি বঙ্গোপসাগর থেকে পর্যাপ্ত জলীয় বাষ্প ঢোকায় ভ্যাপসা গরম আরও বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের দাবি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও প্রতি বছর গরমের তীব্রতা বাড়ছে। আগে যেখানে এপ্রিলের শেষ দিকে তাপপ্রবাহ দেখা যেত, এখন মার্চ থেকেই তাপমাত্রা দ্রুত বাড়তে শুরু করছে।
আবহাওয়াবিদদের একাংশ বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলাগুলিতে মাটির শুষ্কতা ও গাছপালা কমে যাওয়ার ফলেও তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। শহরাঞ্চলে কংক্রিটের বাড়ি ও যানবাহনের তাপও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। বিশেষ করে কলকাতা, আসানসোল ও দুর্গাপুরের মতো শিল্পাঞ্চলে রাতে তাপমাত্রা খুব একটা কমছে না। ফলে মানুষ স্বস্তি পাচ্ছেন না।
এই পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও সতর্কবার্তা দিয়েছেন। দুপুর ১১টা থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না বেরোনোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রচুর জল খাওয়া, ORS, ফল এবং হালকা খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তবে প্রশ্ন একটাই— কবে মিলবে স্বস্তি?
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েকদিন দক্ষিণবঙ্গে গরম ও অস্বস্তি বজায় থাকবে। তবে বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, নদিয়া এবং উত্তর ২৪ পরগনার কিছু এলাকায় বিক্ষিপ্ত ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। উত্তরবঙ্গের কিছু জেলায় ইতিমধ্যেই বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, বঙ্গোপসাগরে অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হলে এবং দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু এগোতে শুরু করলে জুনের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ধীরে ধীরে স্বস্তি মিলতে পারে।
বর্তমানে বাংলার পরিস্থিতি দেখে অনেকেই বলছেন— “এবারের গরম শুধু অস্বস্তিকর নয়, ভয়ঙ্করও।” আর সেই কারণেই সাধারণ মানুষের একটাই প্রার্থনা— যত দ্রুত সম্ভব বৃষ্টি নামুক বাংলার আকাশে।
মতামত লোড হচ্ছে...